শীর্ষ সংবাদ

আজ সেই ভয়াল গণহত্যার কালরাত

২৪-০৩-২০১৬  bdcurrentnews

মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক ভয়াল কলঙ্কিত দিন আজ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অর্থাৎ আজকের তারিখটি বাঙালির ইতিহাসের নৃশংস, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় একটি অধ্যায়ের সাক্ষী। গভীর রাতে পাকিস্তানি মানবরূপী হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসর স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার জানোয়াররা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। ‘অপারেশন সার্চলাইট’র নামে গণহত্যার নীলনকশা নিয়ে নির্বিচারে বাঙালি নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছিল পাকিস্তানি দানবরা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাত্র এক রাতেই হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অর্ধলক্ষাধিক বাঙালিকে। বাঙালির আনুষ্ঠানিক মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে সেই কালরাতে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার অর্ধলক্ষ বাঙালিকে জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। রাজধানীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন ‘কালরাত্রি’ স্মরণে আজ দিনভর আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাতে মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে শহীদদের স্মরণ করবে। বাঙালির মুক্তির ইতিহাসে কালরাত হিসেবে চিরজীবন রক্তের আখরে লেখা থাকবে ২৫ মার্চ। বাঙালি যতদিন থাকবে, বাঙালির ইতিহাস যতদিন থাকবে ততদিন ২৫ মার্চ আমাদের কাছে বেদনাময় হয়ে থাকবে। সেদিন মুক্তির আকাক্সক্ষায় অপেক্ষমাণ বাঙালি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। শহরের রাজপথ, অলিগলি, ফুটপাথ, খেলার মাঠ, ক্যাম্পাস, সর্বত্রই বাঙালির নিষ্পাপ রক্তের স্রোত বয়ে যায়। মধ্যরাতে ঢাকা হয়ে ওঠে লাশের শহর, যা ইতিহাসে ‘কালরাত’ হিসেবে খ্যাত। পঁচিশে মার্চ শুরু হওয়া এ বাঙালি নিধনযজ্ঞ চলেছে পরের টানা ৯ মাস। নৃশংস ও বর্বরোচিত এ হত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তাদের এদেশীয় দোসর স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক-দালাল রাজাকার আলবদর আলশামস বাহিনীর সদস্যরা। তারা পরিকল্পিতভাবে নিধনযজ্ঞ চালায় মুক্তিকামী বাঙালির ওপর। এর আগে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সিরিজ বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু বারবার শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগোনোর আহ্বান জানালেও ইয়াহিয়া তাতে কর্ণপাত না করে বাঙালি হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে করাচি পাড়ি দিলেন। ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগের কিছুক্ষণ পরে ক্যান্টনমেন্ট থেকে জিপ ও ট্রাক বোঝাই সৈন্য ট্যাঙ্কসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে সৈন্যরা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ঘিরে ফেলে। ‘বাইরে বেরুলেই গুলি’ এমন নির্দেশ জারি করা হয়। শহরজুড়ে তখন ট্যাঙ্কের শব্দ। ঢাকা-করাচি টেলিপ্রিন্টার লাইন কেটে দেয়া হয়েছে। বাইরের পৃথিবী থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন। বেতারের প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। সরকারি কোনো ঘোষণাও প্রচারিত হয়নি সেদিন। এ অবস্থায় পঁচিশ মার্চের সকাল থেকেই অজানা আশঙ্কায় দিন কেটেছে বাঙালির। দিনভর অশান্ত পরিস্থিতি ছিল দেশজুড়ে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত অবধি মিছিল-মিটিং-সেøাগানে মুখরিত রাজধানী ঢাকাবাসীর কেউ ঘুমিয়ে পড়েছিল কেউবা গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঘুমতে যাওয়ার। এক পর্যায়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে রাস্তায় নেমে আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তারা প্রথমে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পরে একে একে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডি ও পিলখানার পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) সদর দফতরসহ রাজধানীর সর্বত্র আক্রমণ চালিয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি বড় শহরেও। রাজারবাগ পুলিশ সদর দফতরে পাকিস্তানি সেনাদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখেও বাঙালি পুলিশ সদস্যরা রাইফেল তাক করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু শত্রুর ট্যাঙ্ক আর ভারি মেশিনগানের ক্রমাগত গুলির মুখে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে যায় সব ব্যারিকেড। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশ সদর দফতর। ১১শ’ বাঙালি পুলিশের রক্ত ঝরিয়ে ক্ষান্ত হয়নি পাকিস্তানি হানাদারেরা, পুরো ব্যারাক গুঁড়িয়ে ও জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এরপর ইকবাল হল (বর্তমানে জহুরুল হক হল) ও জগন্নাথ হলে মধ্যযুগীয় কায়দায় চলে পাকিস্তানি হানাদারদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ। রুমে রুমে ঢুকে ঘুমন্ত ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি হায়েনারা। সে রাতে জগন্নাথ হলের ১০৩ ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের হত্যা করা হয়। রোকেয়া হলেও শকুনের দল তছনছ করে দিয়েছিল সবকিছু। নরপশুরা সেদিন হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণ, লুট, জ্বালাও-পোড়াও করেছিল শহরের সব জায়গায়। তবে রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাঙালি ছাত্র-জনতা। ঢাকার ফার্মগেট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চারপাশেই ছিল এ প্রতিরোধ। প্রতিরোধ ছিল চট্টগ্রামেও। কিন্তু এসব প্রতিরোধ ঠেকাতে পারেনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যা। পঁচিশ মার্চের এ জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞের পরে অসম সাহসী বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ঘটে। পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতারের আগ মুহূর্তে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এর আগে ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বাঙালি জাতিকে প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেন। তার সে নির্দেশের পরে বাঙালি জাতি সশস্ত্র সংগ্রামের লক্ষ্যস্থির করে দেশব্যাপী সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলে। অপেক্ষা ছিল শুধু বঙ্গবন্ধুর চূড়ান্ত নির্দেশের। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরপরই শুরু হয় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম। আন্দোলন-প্রতিরোধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসে সেনা ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা। জাতির অস্তিত্ব রক্ষার এ লড়াইয়ের দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর ৩০ লাখ শহীদের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর জš§ নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

সকল সংবাদ - শীর্ষ সংবাদ