শীর্ষ সংবাদ

অন্তরালের গুণীদেরও সম্মান জানাতে চাই

২৪-০৩-২০১৬  bdcurrentnews

পাদপ্রদীপের বাইরে থেকে যারা সমাজের উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন সরকার তাদেরও সম্মান জানাতে চায় বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের জন্য ১৫ ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পদক দিয়ে একথা বলেছেন তিনি। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পুরস্কার জয়ী এবং তাদের প্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। খবর বিডিনিউজ২৪ডটকমের। অনুষ্ঠানে বক্তব্যে পদকপ্রাপ্তদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যাতে অন্যরা কাজ করেন সে প্রত্যাশা জানান শেখ হাসিনা। আলোচনার বাইরে থাকা গুণীদের সম্মান জানানোর আগ্রহের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এখনো গ্রাম বাংলার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেকেই আছেন। তাদের খবরও হয়তো আমরা পাই না। কিন্তু আমরা চাই তাদের খবর যেন আমরা পাই। যে যেখানে যেভাবে সামাজিক উন্নয়নে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বা দেশের সাংস্কৃতিক জগতে, সাহিত্য জগতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছেন আমরা যেন তাদের সš§ান করতে পারি। এজন্য ওই গুণীদের সম্পর্কে তথ্য প্রাপ্তি প্রত্যাশা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে তথ্যগুলো আমাদের জানা একান্তভাবে দরকার। আগামীতে সে তথ্য আমরা আরো পাব। আমরা তাদের সš§াননা দিতে চাই শুধু এই কারণেই, তারা যে দেশের জন্য অবদান রাখলেন, জাতির জন্য অবদান রাখলেন, জাতির জন্য একটা পথিকৃৎ সৃষ্টি করে গেলেন, আমরা সেই স্বীকৃতিটা দিয়ে যেতে চাই। প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নির্যাতিত নারী এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করেন। ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এ বছর ১৫ বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠানকে মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং উন্নয়নসহ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। যারা কাজ করেন, তারা পুরস্কারের আশায় কাজ করেন না। দেশের সেবা, মানুষের কল্যাণ- এই চিন্তা মাথায় রেখেই তারা কাজ করে যান। জাতির সার্বিক উন্নয়নে যারা বিশেষ অবদান রেখেছেন, তাদের সš§ানিত করলে আগামী প্রজš§ অনুপ্রাণিত হবে বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। আর, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য অবদান রেখেছেন, তারা তাদের জীবনকে দেশমাতৃকার জন্য উৎসর্গ করেছেন, সব সময় তারা আমাদের জন্য বরেণ্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা এবং কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মাধ্যমে দেশের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করা হয়। একটি দেশে যদি ১৯টি ক্যু হয়, প্রতিনিয়ত যদি এই হত্যাকাণ্ড চলে আর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পালা চলে; সে দেশ কখনোই আর্থ-সামাজিকভাবে উন্নতি লাভ করতে পারে না বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সš§ানজনক অবস্থানে যেতে পারে না। দেশের উন্নয়নে পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা সেটা ঘোষণা দিয়েছি। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করব। আমাদের গৃহীত সামাজিক কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশ নি¤œ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সালের পূর্বেই আমরা মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে পারবÑ এই বিশ্বাস আমার আছে। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আরো অনেক দূর যেতে চাই। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হতে চাই। একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না, ক্ষুধায় কাতর থাকবে না, রোগে চিকিৎসা পাবে, প্রতিটি মানুষ শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবন পাবেÑ এটাই আমাদের লক্ষ্য। আর, সে লক্ষ্য নিয়েই আমাদের সরকার কাজ করে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ৩২৭ জন বিদেশি বন্ধু ও ১১টি প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আমি মনে করি, এটা আমাদের কর্তব্য তাদের সš§াননা দেয়া। স্বাধীনতার চেতনায় ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, আসুন, লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি। পদকপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে সৈয়দ হাসান ইমাম অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, পদক পাওয়ার আশায় কেউ কাজ করে না। অন্তরের তাগিদেই কাজ করেন। দেশ ও জাতি তার কাজের মূল্যায়ন করলে, তিনি মানবকল্যাণ ও সৃজনশীল কাজ করতে আরো উৎসাহিত হন। এর আগে পদকপ্রাপ্ত এবং তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছবি তোলেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতা পদক পেলেন যারা: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ ১৫ জন এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ভূষিত করা হলো স্বাধীনতা পুরস্কারে। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগঠক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্ষেত্রে এই পদক দেয়া হয়েছে এবার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এবার স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন পাটের জিনোম সিকোয়েন্স উšে§াচন করে সাড়া ফেলে দেয়া বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। তোষা ও দেশি পাটের জীবন রহস্য আবিষ্কারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তার এই মরণোত্তর পুরস্কার। প্রয়াত মাকসুদুলের পক্ষে তার স্ত্রী রাফিয়া হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ পদক নেন। মন্ত্রিসভার আরেক সদস্য বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক এবার এ পুরস্কার পেয়েছেন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ১৯৭১ সালে ভারতের মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্প, অপারেশন ক্যাম্প ও শরণার্থী ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে এই স্বীকৃতি। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্ষেত্রে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজসেবক মরহুম মৌলভী আচমত আলী খান। তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক নেন আচমত আলীর সন্তান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। সুপারসনিক এয়ারক্রাফট এফ-৬ এর পাইলট এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ এয়ারফোর্স গঠন প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনকারী অবসরপ্রাপ্ত স্কোয়াড্রন লিডার বদরুল আলম বীরউত্তমও পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কার। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন বদরুল আলম। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ১৬টি অপারেশন পরিচালনা করেন। এ সম্মাননা পেয়েছেন ১৯৭১ সালে রাজশাহী জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক রাজশাহী পুলিশ লাইনস আক্রমণ প্রতিরোধে পুলিশ ফোর্স সংগঠনে নেতৃত্বদানকারী শহীদ শাহ আবদুল মজিদ। তার পক্ষে পদক নেন তার ছেলে মামুন মাহমুদ শাহ। রাঙ্গামাটিতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে নেতৃত্বদানের জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শাহাদাতবরণকারী রাঙ্গামাটির তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক এম আবদুল আলীও এবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন। তার কন্যা নাজমা আক্তার লিলির হাতে স্বাধীনতা পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীনতার পক্ষে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার এবার সৈয়দ হাসান ইমামকে স্বাধীনতা পদক দিয়েছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী এবং রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হাইকমিশন, লন্ডনে কর্মরত থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী এবং বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান নিজের হাতে লিখেছিলেন যিনি, সেই এ কে এম আবদুর রউফও স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন এবার। প্রয়াত চিত্রশিল্পী রউফের পক্ষে তার স্ত্রী শাহান আরা রউফ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বাধীনতা পদক নেন। ১৯৭১ সালে দিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনে কর্মরত থাকাকালে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী এবং দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রথম মিশন স্থাপনকারী কে এম শিহাব উদ্দিন মরণোত্তর এ পুরস্কার পেয়েছেন। তার ভাই কে এম ফরিদ উদ্দিন অনুষ্ঠানে পদক গ্রহণ করেন। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী মরহুম রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম এবার স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন মাতৃভাষা ক্ষেত্রে। প্রয়াত রফিকুল ইসলামের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পদক নেন মেয়ে দিলরাজ বুলি ইসলাম। শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ রফি খান (এম আর খান) চিকিৎসা বিদ্যায় এবার এ পুরস্কার পেয়েছেন। আর সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার নেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, যিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ১৯৭৭ সালে প্রথম কবিতার রচয়িতা। স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদান এবং দেশের জলসীমায় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দায়িত্ব পালনরত বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবারের স্বাধীনতা পদক পেয়েছে। ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনীর প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বাধীনতা পদক গ্রহণ করেন। পুরস্কারজয়ী প্রত্যেকে পেয়েছেন একটি করে স্বর্ণপদক, সনদ এবং পুরস্কারের অর্থমূল্য হিসেবে দুই লাখ টাকার চেক। তাদের পক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক সৈয়দ হাসান ইমাম অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। মস্ত্রিসভার সদস্য, এমপিসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সকল সংবাদ - শীর্ষ সংবাদ