শীর্ষ সংবাদ

খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল জ্বালানি তেল

০১-০১-১৯৭০  bdcurrentnews

জ্বালানি তেল এখন খোলাবাজারের পণ্য হয়ে উঠেছে। এখানে সেখানে ড্রামে করে বিক্রি হচ্ছে। ফলে বাজার ভরে উঠেছে ভেজালে। নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বিক্রিও কমেছে বিপিসির। রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। দেশের উত্তরাঞ্চল, সিলেট ও চট্টগ্রামে খোলাবাজারে জ্বালানি তেল বিক্রির হার বেশি বলে জানা গেছে। এদিকে খোলাবাজারে ভেজালে ভরা জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ করতে জ্বালানি বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট একাধিক জেলা প্রশাসককে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগ থেকে এই চিঠি দিয়ে বিশেষ অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া, দিনাজপুরে প্রধান সড়কের একটু দূরে ড্রামে করে কনডেনসেট মিশিয়ে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি কিছু এলাকার বাড়িতেও তেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এসব তেল স্বাভাবিক দামের চেয়ে কম দামে পাওয়া যায়। কোনো কোনো এলাকায় আবার একই দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এই ভেজাল তেল ব্যবহারের ফলে যানবাহনের যন্ত্রাংশের ক্ষতি হচ্ছে। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। প্রতারিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের সময় গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট ওঠে। এই কনডেনসেট পরিশোধন করে অকটেন, পেট্রলসহ বিভিন্ন ধরনের তেল পাওয়া যায়। এ কনডেনসেটই পরিশোধন না করে ডিজেলের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। কনডেনসেটের রং প্রায় পানির মতো। তাই তেলের সঙ্গে মিশিয়ে দিলে গ্রাহকের পক্ষে তেলে ভেজাল আছে কিনা তা বোঝার কোনো উপায় নেই। ব্যাপকহারে এই তেল বিক্রির ফলে পেট্রলপাম্পগুলো এখন বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ডিপোগুলো থেকে তেল উত্তোলন কমে গেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে মানবকণ্ঠের চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে ইয়াসীন হীরা জানান, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় উচ্চমাত্রায় সিসাযুক্ত কনডেনসেট মেশানো জ্বালানি তেল বিক্রি করা হচ্ছে। দেশে ১২টি বেসরকারি তেল রিফাইনারি রয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ রূপসা টার্মিনাল, গোল্ডেন অয়েল, ইউনির্ভাসেল, চৌধুরী রিফাইনারি, পিএইচপি, সুপার রিফাইনারি, সিভিও, লার্ক, সিনথেটিক, অ্যাকুয়া মিনারেল টারপেন্টাইন অ্যান্ড সলভেন্টস প্লান্ট। এই কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই পরিশোধন না করে কনডেনসেট খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বগুড়া ব্যুরো থেকে এসএম আবু সাঈদ জানান, বগুড়ায় ১২টি উপজেলায় অবৈধভাবে ভেজাল তেল বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে দেড়শতাধিক দোকানি এ ভেজাল তেল বিক্রি করছেন। অবৈধ এসব দোকান বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় প্রতারিত হচ্ছেন যন্ত্রচালিত যানবাহন মোটরসাইকেল মালিকরা। কনডেনসেট মিশ্রিত পেট্রল ব্যবহারের ফলে মোটরসাইকেল ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। ইঞ্জিনের অনেক যন্ত্রাংশ অকেজো হয়ে পড়ছে বলে জানান মালিকরা। ফলে মেরামত কাজে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হচ্ছে তাদের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার কুন্দারহাট ১টি, চাকলমায় ২টি, ডাকইর ১টি, হাটকঁড়িতে ২টি, পণ্ডিতপুকুর ২টি, ধুন্দারহাটে ১টি, ত্রিমোহনীতে ১টি, শিমলায় ২টি, ভাগবদরের ১টিসহ এই উপজেলায় অন্তত ৩৫টি পয়েন্টে এভাবে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলায় ১০টি পয়েন্টে তেল বিক্রি করা হয়। আক্কেলপুর রাস্তায় মেসার্স আণিকা এন্টারপ্রাইজ, মেইল বাসস্ট্যান্ডে মেসার্স ভিভা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স রেজাউল অ্যান্ড ব্রাদার্স ট্রেডার্স, মেসার্স ছমির ট্রেডার্স, চৌমুহনী বাজারে মেসার্স জাহিদ ট্রেডার্স, সদরের শহরতলায় মেসার্স ছোলায়মান ট্রেডার্স, তালোড়া রাস্তায় মেসার্স তৃষা এন্টারপ্রাইজ, তালোড়া বাজারে মেসার্স খান ট্রেডার্স, আলতাফনগরে মেসার্স খাজা ট্রেডার্স সহ বেড়াগ্রাম বাজারে নাম ব্যবহার না করে প্যাক্ট পয়েন্টে পেট্রল, ডিজেল ও কেরোসিন তেল বিক্রি করা হচ্ছে। বগুড়া শহরের শেরপুর রোডে, গোহাইল রোড, নামাজগড়সহ ১০টি পয়েন্টে এবং শেরপুর উপজেলার রণবীরবালা, মির্জাপুর, ছোনকা, সাধুবাড়ী, আয়রাসহ অন্তত ৩০ পয়েন্ট এ তেল বিক্রি করা হচ্ছে। ধুনট উপজেলার, গোসাইবাড়ি, মথুরাপুরবাজার, চৌকিবাড়ি, নিমগাছী, সোনাহাটা, চিকাশী, গোপাল নগর, খাটিয়ামারিসহ ৫০টি পয়েন্ট খোলাবাজারে পেট্রল বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া সোনাতলা, সারিয়াকান্দি, আদমদীঘি, শিবগঞ্জ, শাজাহানপুরসহ ১২উপজেলায় ১৫০ পয়েন্টে পেট্রল বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে পার্বতীপুর প্রতিনিধি জানান, পার্বতীপুরসহ দিনাজপুর, রংপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় অঞ্চলে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ভেজাল পেট্রল ও ডিজেলের দোকান। অবৈধ এসব দোকান বন্ধে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ না থাকায় প্রতারিত হচ্ছেন যানবাহন বিশেষ করে মোটরসাইকেল মালিকরা। কনডেনসেট মেশানো পেট্রল ও ডিজেল ব্যবহারের ফলে মোটরসাইকেল মালিক ও কৃষকদের শ্যালো মেশিন ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। অকেজো হয়ে পড়ছে ইঞ্জিনের ভেতরের অনেক যন্ত্রাংশ। পার্বতীপুর-সৈয়দপুর সড়কের জাকিরগঞ্জ, বানিরঘাট ও চৌমুহনী মোড়ে ভেজাল তেলের বড় বড় দোকান হয়েছে। এছাড়া পার্বতীপুর-রংপুর সড়কের চান্দের ডাঙ্গা, তুলশীপুকুর মোড়, দিনাজপুর সড়কের ভবেরবাজার ও জশাই মোড়েও রয়েছে একাধিক অবৈধ ভেজাল পেট্রল ও ডিজেলের দোকান। অবৈধ এ দোকান মালিকরা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবাধে ভেজাল জ্বালানি তেল বিক্রি করছে বলে স্থানীয়রা জানায়। এ ব্যাপারে পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরফদার মাহামুদুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি এলাকায় ভেজাল জ্বালানি তেলের দোকানের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করে বলেন, জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে খুব শিগগিরই এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে বিপিসির পরিচালক (বিপণন) মীর আলী রেজা বলেন, সম্প্রতি এই ধরনের অভিযোগ আসছে। দক্ষিণাঞ্চলসহ বেশকিছু অঞ্চলে তল্লাশি চালিয়ে কয়েকশ’ অবৈধ তেলের দোকান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ তেল পাম্পের ন্যায় মাটির নিচে বিশাল আকৃতির ড্রাম বসিয়ে রীতিমতো ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিপিসি জানায়, গত অর্থবছরে তারা ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লাভ করেছে। জ্বালানি তেলে ভেজাল না করতে পারলে এবং পাম্প মালিকরা সরকারি ডিপো থেকে সরাসরি তেল কিনলে লাভ হতো ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পাম্প ও বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর এ অবৈধ ভেজাল কার্যক্রম বন্ধ করা না গেলে বিপিসির লোকসান হবে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। দেশে ৫৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে ১৪ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল পরিশোধন করা হয়। বাকিটা পরিশোধিত জ্বালানি তেল হিসেবে আমদানি করা হয়।

সকল সংবাদ - শীর্ষ সংবাদ